সবুজ সার-Green manure

সবুজ সার-Green manure

সবুজ সার পরিচিতিঃ

সাধারণত জমিতে কোন শস্য বপন করে তা সবুজ অবস্থায়ই আবার সে জমিতে মিশিয়ে দিয়ে যে সার তৈরী করা হয় উহাকে সবুজ সার বলে গাছ জমিতে জন্মাবার পর যখন তাতে ফুল ধরা শুরু হয় তখনই তা চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয় শিম্বীজাতীয় গাছ ধইঞ্চা, শন এবং মটরশুটি সাধারণত আমাদের দেশে সবুজ সার প্রস্তুত করার জন্য ব্যবহার করা হয় -শিম্বীজাতীয় গাছের মধ্যে রাই, সরগম, ভূট্টা প্রভৃতি অন্যান্য দেশে সবুজ সারের জন্য চাষ করা হয়

গাছের গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যঃ

সবুজ সার প্রস্তুতের জন্য যে সমস্ত ফসল ব্যবহার করা হয় সেগুলির বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ

) গাছ দ্রুত বর্ধনশীল হবে অনুর্বর মাটিতে জন্মাবার ক্ষমতা থাকবে হবে

) গাছের অনেক ডালপালা পাতা থাকবে

) গাছ তাড়াতাড়ি পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে

) গাছের কান্ড নরম দ্রুত পচনশীল হবে

) গাছের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতাসম্পন্ন হবে এবং

) যতদূর সম্ভব গাছ শিম্বীপরিবারভূক্ত হবে

জমিতে খাদ্য উপাদান যোগঃ

সবুজ সার ব্যবহার করার মুখ্য উদ্দেশ্য হল জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করা সবুজ সারের জন্য শিম্বীজাতীয় গাছ যখন ব্যবহার করা হয় তখন জমিতে কেবল নাইট্রোজেনই যোগ হয় না অন্যান্য খাদ্যোপাদান ফসফরাস, পটশিয়াম ক্যালসিয়ামেরও যোগ সাধন হয় নিন্মে সবুজ সারজাতীয় শস্যের খাদ্যেপাদানের পরিমাণের একটি তালিকা উল্লেখ করা হল

সবুজ সারজাতীয় শস্যের খাদ্যপাদানের পরিমাণ

সবুজ সারজাতীয় শস্য

 নাইট্রোজেন

   ফসফেট

    পটাশ

    ক্যালসিয়াম   

শন

 .৭৫%

  .১২%

  .৫১%

    .৩৯%   

বরবটী

 .৭১%

  .১৫%

  .৫৮%

    .৬৪%   

মুগকলাই

 .৭২%

  .১৮%

  .৫৩%

    .৭৬%   

মাসকলাই

 .৮৫%

  .১৮%   

  .৫৩%

    .৭৪%   

          

সবুজ সার ব্যবহারের ফলে গড়ে প্রতি একরে ৮০/১০০ পাঃ অর্থাৎ হেক্টরে ৯০-১১২. কেজি নাইট্রোজেন যোগ হয়

শুঁটি জাতীয় সবুজ সার

শুঁটি জাতীয় সবুজ সারের উপযোগী গাছ সারা বছরই চাষ করা যায়, তবে শীতের সময় এর বাড় বাড়তি কম হয়

সবুজ সারের প্রস্তুতিঃ

আমাদের দেশে দুটি সুপরিচিত শস্য রয়েছে যা সবুজ সার তৈরীর জন্য ব্যবহার করা হয় শস্য দুটি হচ্ছেঃ

() ধইঞ্চা

() শন

ধৈঞ্চা:
ধৈঞ্চা বাংলাদেশের মাটি আবহাওয়াতে ভাল জন্মায় দু-একটি চাষ মই দিয়ে ধৈঞ্চার বীজ বৈশাখ/জ্যৈষ্ঠ মাসে ঘন করে বুনে দিন বীজ বোনার আগে শিকড়ের শুঁটির সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি বীজ ঘন করে ছিটিয়ে বুনে তা হালকা চাষ দিয়ে বীজগুলো মাটির নিচে ফেলে দিন কোনো প্রকার যত্ন ছাড়াই দেখবেন দু'মাসের মাধ্যে গাছে ফুল দেখা দিয়েছে তখনই গাছ সবুজহ সার তৈরীর উপযুক্ত হয়েছে ধরে নেবেন গাছ বেশি লম্বা হয়ে গেলে / টুকরা করে কেটে নিয়ে ক্ষেত্রে মই দিয়ে গাছ মাটির সাথে মিশিয়ে দিন ক্ষেত্রে সামান্য পানি থাকলে ধৈঞ্চা মই দেয়ার পর খুব সহজে কাদামাটির সাথে মিশে যায় সাধারণত প্রথম চাষ দেয়ার ১০/১২ দিনের মাথায় পুনরায় চাষ মই দিন দেখবেন মোট ১০/১৫ দিনের মাথায় ধৈঞ্চা গাছ মাটির সাথে মিশে গিয়ে সুবজ সারে পরিণত হয়েছে ধৈঞ্চা সারের পর রোপা আমন ভালো জন্মায়- তাই ধৈঞ্চা চাষের পর রোপা আমনের চাষ করুন


শণ:
শণ একটি উৎকৃষ্ট সবুজ জাতীয় সার ধৈঞ্চার অনুরূপ পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি ৪০/৫০ কেজি বীজ ঘন করে উঁচু জমিতে বপন করুন শণ গাছ দাঁড়ানো পানি সহ্য করতে পারে না তাই ক্ষেতে নালা রাখুন গাছ ./. মিটার উঁচু বা / সপ্তাহ পর ফুল দেখা দিলেই ধৈঞ্চার মতো মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন ১৫ দিন পর আবার মই দিয়ে ক্ষেতের পানির সাথে মিশিয়ে দিন এমনি গাছ পচে যেতে সময় লাগবে এক মাস শণ গাছ পচে গিয়ে মাটিতে উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার প্রস্তুত করে

দুই হইতে আড়াই মাসের মধ্যে যখন গাছে ফুল ধরিতে থাকে তখন লাঙ্গল দিয়ে গাছগুলি মাটি চাপা দিতে হয় পর পর কয়েকবার চাষ মই দিলে পানির সান্নিধ্যে গাছ মাসখানেকের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় শনের সাহায্যে সবুজ সার করার পর যে যে ফসলের চাষ করা হয় সেগুলি হচ্ছে আখ, তামাক, আলু এবং বিলাতী সব্জী

বরবটি:

বরবটিও সবুজ সার হিসাবে চাষ করা যায় যদিও বরবটি মানুষ পশুখাদ্য হিসাবেই বেশি চাষ হয় তথাপি চীনে সবুজ সার হিসাবে চাষে এর ফলন বেশি বরবটি উঁচু জমির শস্য পানি দাঁড়ালে ভাল কখনও হয় না লাল মাটির জন্য খাড়টি অত্যন্ত উপযুক্ত সবুজ সার অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল বরবটি গাছে মাত্র ছয় সপ্তাহের মাঝেই ফুল আসে এবং তখনই তা সবুজ সার হিসাবে ব্যবহারের উপযুক্ত হয় সময় চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সবুজ সার প্রস্তুত করতে হয়

সবুজ সারের উপকারিতাঃ

জমিতে সবুজ সার ব্যবহার করলে যে উপকার সধিত হয় তা নিন্মে বর্ণণা করা হলঃ

) মাটিতে জৈব পদার্থের যোগ

সবুজ সার মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে যা শেষ পর্যন্ত হিউমাসে রূপান্তরিত হয় এটি অনেক খাদ্যেপাদান ধরে রাখে সেগুলি সময়ান্তরে গাছের গ্রহণযোগ্য করে মাটির রসে ছড়িয়ে দেয় এটি মাটির ভৌত ধর্মেরও যথেষ্ট উন্নতি করে থাকে, যেমন-মাটির দানাবন্ধন সহজতর হয়, বায়ু চলাচল বাধামুক্ত হয় এবং তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা হয়

) মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ

সবুজ সার প্রস্তুতের জন্য শিম্বীজাতীয় ফসল ব্যবহার করিলে জমিতে কিছু পরিমানে নাইট্রোজেন অবশ্যই যোগ হয় মাটির উর্বরতা তথা উদ্দিষ্ট ফসলের বৃদ্ধি পরিপুষ্টির জন্য এটি খুব মূল্যবান উপাদান

) জমিতে জৈবিক প্রক্রিয়া ত্বরান্তিকরণ

সবুজ সারের মাধ্যমে মাটিতে যে জৈব পদার্থের যোগ হয় তা মাটির-মধ্যোস্থিত জীবাণুসমূহের প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত ত্বরান্বিত হয় এছাড়া  আরো নানারকম জৈবিক ক্রিয়া ফলে মাটির উর্বরতা বেশ বৃদ্ধি পায়

) ভূমি খাদ্যেপাদান সংরক্ষণ

সবুজ সার ব্যবহারের ফলে জমির উপরের মাটি সংরক্ষিত হয় ধইঞ্চা, শন, কলাই প্রভৃতি ফসল যখন জমিতে জন্মাতে থাকে তখন সেই শস্যসমুহ এত ঘন হয়ে জন্মে যে বৃষ্টির পানি মাটির উপরে জোরের সঙ্গে পড়তে পারে না অথবা ঝড়ে উপরিভাগের মাটি উড়িয়ে নিতে পারে না, ফলে মাটি ধংসের হাত হইতে রক্ষা পায়

অন্যান্য শস্যের মতো সবুজ সারজাতীয় ফসলও জমি হতে খাদ্যেপাদান গ্রহণ করে থাকলেও পরে সেই খাদ্য উপকরণসমূহ আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেয়