মৌমাছি পালন পদ্ধতি

ভূমিকা:
আদিকাল থেকে মৌমাছি মানুষের নিকট অতি পরিচিত এক প্রকার ক্ষুদ্র, পরিশ্রমী ও উপকারী পতঙ্গ। সাধারণত দলবদ্ধভাবে বাস করে বলে এদেরকে সামাজিক পতঙ্গ বলা হয়। মৌমাছি থেকে আমরা মধু ও মোম পাই ।
মৌমাছির প্রজাতি:
আমাদের দেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়, যথা:
পাহাড়ী মৌমাছিঃ
এরা আকারে সবচেয়ে বড়। বড় বড় গাছের ডালে, পাহাড়ের গায়ে এরা চাক বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ১০ কেজি। এরা পোষ মানে না তাই বাক্সে লালন-পালন করা যায় না।
ক্ষুদে মৌমাছিঃ
এরা আকারে সবচেয়ে ছোট। এরা ঝোপ জাতীয় গাছের ডালে, পাতায় ও শুকনো কাঠি প্রভৃতিতে চাক বাঁধে। চাকার আকার খুব ছোট। বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম । এরা শান্ত প্রকৃতির। তবে এক স্থানে বেশিদিন থাকে ন।
ভারতীয় মৌমাছিঃ
এরা আকারে মাঝারি ধরনের। অন্ধকার বা আড়াল করা স্থান গাছের ফোকর, দেওয়ালের ফাটল,আলমারি, ইটের স্তুপ ইত্যাদি স্থানে এরা চাক বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ৪ কেজি। এরা শান্ত প্রকৃতির। তাই বাক্সে লালন-পালন করা যায় ।
মৌমাছি চাষ:
মৌমাছিকে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে এনে মৌচাকের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালন করাকেই বলা হয় মৌমাচি পালন। পালনের জন্য ভারতীয় জাতের মৌমাছি সবচেয়ে উপযোগী। ছোট সেনালি বর্ণের ও সাদা ডোরাকাটা এ মৌমাছিরা গাছের গর্তে বা অন্য কো গহবরে একাধিক সমান্তরাল চাক তৈরি করে বসবাস করে। গর্তে প্রবেশ পথের সঙ্গে চাকগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে। মৌমাছিদের এরূপ বাসস্থানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয় কাঠের বাক্স। কাঠের মৌবাক্স মৌমাছি পালনই আধুনিক ব্যবস্থা। লোকালয় ও বিভিন্ন বনাঞ্চলের মৌচাক থেকেই তো এই মধু আর মোম সংগ্রহ করা সম্ভব ।
মৌমাছির চাক:
মৌমাছির চাক মোম দিয়ে তৈরী। চাক ছোট ছোট খোপ বিশিষ্ট। প্রতিটি খোপে থাকে ছয়টি দেওয়াল। তবে শিশু শ্রমিকের ও মধু জমানোর খোপগুলো পরিমাপে একটু ছোট, শিশু পুরুষদের একটু বড় এবং শিশু রাণীর বেশ বড় ও লম্বাটে। শিশুদের খুপগুলো সাধারণত চাকের নিচের দিকে ও মধু জমানোর খুপগুলো উপরের দিকে থাকে। শিশু রাণীর খোপে থাকে সাধারণত চাকের নিচের দিকের কিনারায়। ডিম পাড়ার পূর্বে রাণী দেখে নেয় খোপের মাপ, যাতে নির্দিষ্ট মাপের খোপে নির্দিষ্ট প্রকারের ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন দিনের মধ্যে ডিম ফুটে শ্রককীট বা শিশু মৌমাছি বেড়িয়ে আসে। শ্রমিক মৌমাছি এসব শিশু মোমাছিদের প্রথম তিন দিন মধু ও পরাগরেণুর পাশাপাশি রাজসুধা খেত দেয়। রাজসুধা তৈরী হয় শ্রমিক মৌমাছির মুখের এক বিশেষ গ্রন্থি থেকে । প্রায় ৮/৯ দিন পর শ্রমিকের সব শুককীটের মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয়। এ বন্ধ খোপের মধ্যে শুককীট মুককীটে বা পুত্তলিতে রুপান্তরিত হয়। ভাবী রাণীর ক্ষেত্রে খোপের বন্ধ থাকার সময় প্রায় ৭ দিন, শ্রমিকের ক্ষেত্রে ১২ দিন ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৫ দিন। এরপর মুককীট পূর্ণ বয়স্ক মৌমাছিতে রুপান্তরিত হয় এবং খোপের মুখ কেটে বেড়িয়ে আসে।
মধু ও মোম:
মধু একান্তভাবে মৌমাছির তৈরী এক প্রকার উপাদেয় খাদ্য। শ্রমিক মৌমাছিরা ফুলের মিষ্টি রস শুষে নেয় এবং তা জমা করে পাকস্থলীর উপরে এক বিশেষ অঙ্গে যাকে মধুথলি বলে। ফুলের মিষ্টি রস মধুথলিতে জমা করার সময় এর সঙ্গে লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উৎসেচক মেশায়। এর ফলে মিষ্টি রস পরিবর্তিত হয়ে আংশিক মধু তৈরী হয়, যা চাকে এনে ঢেলে দেয় মধু রাখার খোপগুলোতে। তরুণ শ্রমিক মৌমাছিরা এ সময় ছুটে এসে ঐ মধু আবার মুখে ভরে এবং তাদের লালার সংগে মিশিয়ে তৈরী করে আসল মধু এবং তা জমা করে খোপে। শ্রমিক মৌমাছিরা জোরে ডানা নেড়ে খোপে রক্ষিত মধু থেকে বাড়তি পানি সরিয়ে দেয়। ফলে এক সময় ফুলের মিষ্টি রস হয়ে যায় ঘন মধু, যা জমা রাখে নিজেদের ও বাচ্চাদের খাবার হিসাবে। মধু জমা রাখার পর খোপগুলোর মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয়। শ্রমিক মৌমাছির পেটের তলায় পকেটের মত ভাজ থাকে মোমগ্রন্থি। সেখানে তৈরী হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতের মত মোম কণা। এ মোম দিয়ে শ্রমিকেরা বানায় বাসা।
মৌমাছি পালনের বাক্স:
আমাদের দেশে প্রধাণত ভারতীয় মৌমাছি লালন-পালন করা হয়। এ মৌমাছির বাক্স সাধারণত কাঠাল কাঠের তৈরী এবং ২৮.৬ সে.মি x ২৭.৭ সে.মি x ১৭.৪ সে.মি মাপ বিশিষ্ট হয়। এর নিচের দিকে খোলা, যা একটি কাঠের পাটাতনের উপর বসানো থাকে। বাক্সের উপর কাঠের একটি ঢাকনা থাকে। ঢাকনার নিচে সাতটি সমান্তরাল কাঠের ফ্রেম থাকে । এ মৌমাছিরা চাক বাঁধে। এ প্রকোষ্ঠের উপর ফ্রেমসহ আরেকটি প্রকোষ্ঠ বসানো থাকে। উপরের প্রকোষ্ঠকে মধু প্রকোষ্ঠ ও নিচের প্রকোষ্ঠকে বাচ্চা প্রকোষ্ঠ বলে। যে স্থানটি অপেক্ষাকৃত উচু, নির্জন, ধোয়া অথবা গ্যাসমুক্ত, শুকনো এবং ছায়াযুক্ত এবং আশে-পাশে পর্যাপ্ত ফুল সমৃদ্ধ গাছ-গাছড়া আছে সেখানে মৌমাছির বাক্স বসাতে হয়।
মৌমাছি সংগ্রহ ও কৃত্রিম খাবার:
প্রকৃত থেকে ভারতীয় মৌমাছি (রাণী ও কিছু শ্রমিক) সংগ্রহ করে অথবা প্রতিষ্টিত মৌচাষীর নিকট থেকে ক্রয় করে মৌচাষ কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। বাক্সবন্দীর প্রথম ৩/৪ দিন কৃত্রিম খাবার যথা চিনির ঘন সরবত বা সিরাপ দেবার প্রয়োজন হয়। এরপর মৌমাছিরা নিজেদের খাবার নিজেরা সংগ্রহ করে থাকে। কখনো কখনো পরিবেশে খাবার ঘাটতি পড়লে ও কৃত্রিম খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
মৌমাছির উপযোগী গাছ-পাল:
মৌমাছির জন্য ফুলের মিষ্টি রস ও পরাগরেণু সমৃদ্ধ গাছ-পালার প্রয়োজন। সারা বছর মিষ্টি রস ও পরাগরেণু সমৃদ্ধ ফুল প্রাপ্তি যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য নিম্নলিখিত গাছ-পালা মৌমাছি এলাকার আশে-পাশে (২/৩ কিলোমিটারের মধ্যে) স্থানভেদে রোপণ বা চাষ করা যেতে পারে। আম, জাম, কলা, লিচু পেয়ারা, ডালিম, নারিকেল, বেল, কমলা লেবু, ছোলা, সয়াবিন শিমূল ,কার্পাস, কাজু বাদাম ইত্যাদি।
মৌমাছির ঝাঁক বাঁধা:
সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে মৌমাছির ঝাঁক বাঁধার প্রবণতা দেখা যায়। বাক্সে মৌমাচছর সংখ্যা বেড়ে গেলে, খাদ্যভাব হলে মৌমাছিরা ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়। পুরাতন রাণী উড়ে যাবার পূর্বে শ্রমিকরা চাকে প্রথমে ভাবী পুরুষ ও পরে ভাবী রাণী মৌমাছির খোপ তৈরী করে। এগুলো খুজে বের করে সাবধানে কেটে ফেলে দিলে ঝাঁক বাঁধা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফ্রেমের চাকে নতুন রাণীর খোপ দেখা গেলে সেই ফ্রেম কিছু মৌমাছিসহ নতুন বাক্সে স্থানান্তর করে নতুন চাক তৈর করা যায়।
মৌমাছির শত্রু এবং রোগঃ
|
নাম |
মোমপোকা |
|
|
লক্ষণ |
১। ভিজে, স্যাতসেঁতে আবহাওয়ায় মোমপোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশী হয়। ২। চাকের কুঠুরির উপরে মাকড়সার জালের ন্যায় আবরণ দেখেই বোঝা যায়। ৩। একটি মোপোকারয় আক্রান্ত ঢাকনাযুক্ত পিউপার কুঠুরির মুখ খোলা এবং ভেতরে মৃত পিউপা পাওয়া যায়। |
|
|
প্রতিকার |
১। মৌবাক্স পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। ২। পুরনো ও ময়লা চাক সরিয়ে ফেলা। ৩। পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে বাঙ্রে মেঝে পরিস্কার করা। ৪। মোমপোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্যারাডাইক্লোরো বেনজিন নামক ওষুধ সামান্য পরিমানে বাক্স কোণায় রেখে দিলে এই পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ৫। এ সময়ে রাতে বাক্সের গেইট বন্ধ করে রাখতে হবে এবং সকালে খুলে দিতে হবে। |
|
|
নাম |
মোমের মথ পোকা |
|
|
লক্ষণ |
১। এ পোকা চাকে ডিম পাড়ে। ২। ডিম ফুটে শুক্রকীট বের হয়ে মোম খায়। ৩। এছাড়া নানাবিধ পাখি, মাকড়সা, টিকটিকি, পিপড়া, ব্যঙ ইত্যাদি মৌমাছির শত্রু । |
|
|
প্রতিকার |
১। এগুলো থেকে মৌমাছি রক্ষা করার জন্য সর্তক দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন হয়। |
|
|
নাম |
অ্যাকারাইন রোগ |
|
|
লক্ষণ |
১। এ রোগ সাধারণত পূর্ণবস্ক মৌমাছিদের হয়ে থাকে। ২। রুগ্ন মৌমাছির ডানাগুলো বিভক্ত হয়ে ইংরেজি অক্ষর ‘ক’ এর মতো হয়ে যায় এবং অনেক মৌমাছিকে বাক্সে সামনে বুকে হাঁটতে দেখা যায়। ৩। বাক্সে সামনে আমাশয় এর মতো হলুদ পায়খানা পড়ে থাকে। ৪। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে প্যারালাইসিস হতে দেখা যায়। ৫। আক্রান্ত রানী ডিম দেয়া বন্ধ করে দেয়। |
|
|
প্রতিকার |
১। রোগের প্রতিকার হল-মৌবাঙ্রে ভেতরে মিথাইল স্যালিসাইলেটের বাষ্প দেয়া। ২। ছোট একটি বোতলে মিথাইল স্যালিসাইলেট নিয়ে রবার কর্ক দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে। |
|
মৌমাছি পালনের উপকারী দিকসমূহ:
ক) দেশে খাটি মধুর চাহিদা পূরণ করে পুষ্ঠিহীনতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কারণ মধু শর্করা জাতীয় খাদ্য। যা বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন,এনজাইম ও খনিজ পদার্থ থাকে।
খ) মধু রোগ (যথা: সর্দি, কাশি,বাত, ব্যাথা ইত্যাদি) জীবানুনাশক হিসাবে ব্যবহার করে।
গ) মোম, মোমবাতি, প্রসাধন (কোল্ড ক্রীম, সেভিং ক্রীম, স্নো ইত্যাদি) ঔষধ (বিভিন্ন মলম তৈরী ব্যবহার হযে থাকে)
ঘ) মধু ও মোম বিক্রয় করে বাড়তি আয়ের সংস্থানের মাধমে পারিবারিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করে যা সার্বিকভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির দারিদ্র্য দূরীকরনের সাহায্য করে।
ঙ) ফুলের পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষিজ, ফলদ ও বনজ গাছ-পালার ফলন ও গুণগতমান বৃদ্ধি করে ও জীব বৈচিত্রে সংরক্ষনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মৌমাছি পালনের আয়-ব্যয়ঃ
উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে মৌমাছি পালন করলে এবং এলাকায় পর্যাপ্ত সহায়ক গাছ-পালা থাকলে একটি বাক্স থেকে মধূ (শীতকালে) ৭/৮ কেজি এবং বছরে ১৮/২০ কেজি খাটি মধু সংগ্রহ করা যায়।
আয় :
উৎপাদিত মধু = ১৫ কজি
কেজি প্রতি টাকা ৩০০.০০ হিসেবে
মোট (১৫x৩০০.০০) = ৪,৫০০.০০
ব্যয় :
মৌমাছির বাক্সের দাম
= টাকা ৭০০.০০
মৌমাছির দাম = টাকা ৭০০.০০
কৃত্রিম খাদ্য
= টাকা
৫০.০০
অন্যান্য
= টাকা ৫০.০০
মোট
= টাকা ১,৫০.০০
অতএব,
লাভ: = আয়-ব্যয়
= ৪,৫০০.০০ টাকা - ১,৫০০.০০ টাকা
= টাকা ৩,০০০.০০ টাকা
উপসংহারঃ
বাংলাদেশে মৌমাছি চাষের উপযুক্ত আবহাওয়া, গাছ-পালা ও পরিবেশ বিদ্যমান। বাক্স ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রী একবার ক্রয় করলে প্রায় ১০ বছর তা ব্যবহার করা যায়। তাই আমরা সকলে মৌমাছির চাষ বাড়িয়ে খাটি মধু ও মোম উৎপাদনসহ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ও পরিবেশ উন্নয়নে এগিয়ে আসি।