Rose -গোলাপ


গোলাপ পরিচিতি :
গোলাপকে সৌন্দর্য্য ও লাবন্যের প্রতীক হিসেবে
বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এটি একটি শীতকালীন মৌসুমী ফুল হলেও বর্তমানে গোলাপ সারা বছর ধরেই চাষ করা হয়। কমনিয়তা, বর্ণ, গন্ধ, ও
সৌন্দর্যের বিচারে গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয়। ফুলপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ফুল হল গোলাপ। এটি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জলবায়ুতে খুব সহজেই খাপ
খাইয়ে
নিতে পারে বলে পৃথিবীর সব দেশেই সারাবছর ধরে গোলাপের চাষ হয়। গোলাপ সাধারণত কাট ফ্লাওয়ার
হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, লন, কেয়ারী, বারান্দা, বাগান সাজাতে
গোলাপের জুড়ি মেলা ভার । সুগন্ধি ও আতর শিল্পেও গোলাপের ব্যবহার লক্ষ্য দেখা যায়।
জমি নির্বাচন:
গোলাপ চাষের জন্য উর্বর দোআঁশ মাটির জমি নির্বাচন করা উত্তম। ছায়াবিহীন উঁচু জায়গা যেখানে জলাবদ্ধতা হয়না, এরূপ জমিতে গোলাপ ভালো জন্মে।
জমি তৈরি:
নির্বাচিত জমি ৪-৫ টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুর ঝুরা ও সমতল করতে হবে। এরপর মাটি কুপিয়ে ৫ সেমি উঁচু করে ৩ মি. x ১মি. আকারের বেড বা কেয়ারি তৈরি করতে হবে। এভাবে কেয়ারী তৈরির পর নির্দিষ্ট দূরত্বে ৬০ সেমি. x ৬০ সেমি. আকারের এবং ৪৫ সেমি. গভীর গর্ত খনন করতে হবে। গর্তের উপরের মাটি ও নিচের মাটি আলাদা করে রাখতে হবে। চারা রোপণের ১৫ দিন আগে গর্ত করে খোলা রাখতে হবে। এ সময়ে গর্তের জীবাণু ও পোকামাকড় মারা যায়।
জাত সমূহ:
পৃথিবীজুড়ে গোলাপের অসংখ্য জাত রয়েছে। জাতগুলোর কোনোটির গাছ বড়, কোনোটি ঝোপালো, কোনোটি লতানো। জাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গোলাপ সাদা, লাল, হলুদ, কমলা, গোলাপি এবং মিশ্রিত রঙের হয়ে থাকে। এ ছাড়াও রানি এলিজাবেথ (গোলাপি), ব্ল্যাক প্রিন্স (কালো), ইরানি (গোলাপি), মিরান্ডি (লাল),
পাপা
মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার, সিটি
অব বেলফাষ্ট প্যারাডাইস, ব্লু-মুন, , দুই রঙা ফুল আইক্যাচার চাষ করা হয়।
রোপণ সময়ঃ
বাংলাদেশে অক্টোবর থেকে
ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত গোলাপের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।
বংশবিস্তার :
গোলাপের বংশ বিস্তারের জন্য অবস্থাভেদে শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম ও চোখ কলম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য বীজ উৎপাদন করে তা থেকে চারা উপাদন করা হয়।
সার প্রয়োগ:
প্রতি গর্তের উপরের মাটির সাথে ছকে প্রদত্ত সারগুলো মিশিয়ে গর্তে ফেলতে হবে। এরপর নিচের মাটির সাথে ৫ কেজি পচা গোবর, ৫ কেজি পাতা পচা সার ও ৫০০ গ্রাম ছাই ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তের উপরের স্তরে দিতে হবে। এভাবে গর্ত সম্পূর্ণ ভরাট করার পর ১৫-২০ দিন ফেলে রাখলে সারগুলো পচবে ও গাছ লাগানোর উপযুক্ত হবে। বর্ষাকালে যাতে গাছের গোড়ায় বৃষ্টির পানি জমে না থাকে, সে জন্য নালা তৈরি করতে হবে।
চারা বা কলম রোপণ:
আশ্বিন মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে পৌষ মাস পর্যন্ত চারা লাগালে বেডের গর্তের মাঝখানে ক্ষুদ্রাকৃতির গর্ত খুঁড়ে চারা লাগাতে হয়। প্রথমে পলিথিন ব্যাগ বা মাটির টব থেকে চারা বের করে দুর্বল শাখা, রোগাক্রান্ত শিকড় ইত্যাদি কেটে ফেলতে হয়। চারা লাগিয়ে গোড়ায় শক্তভাবে মাটি চেপে দিতে হবে। চারা রোপণের পর চারাটি একটি খুঁটি পুতে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। চারা লাগিয়ে গোড়ায় পানি দেওয়া উচিত। ২-৩ দিন ছায়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।
অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা:
আগাছা দমন: গোলাপের কেয়ারিতে অনেক আগাছা হয়। আগাছা তুলে ফেলতে হবে।
পানি সেচ: মাটির আর্দ্রতা যাচাই করে গাছের গোড়ায় এমনভাবে সেচ দিতে হবে যেন মাটিতে রসের ঘাটতি না হয়।
পানি নিকাশ:
গোলাপের কেয়ারীতে কোনো সময়ই পানি জমতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ গোলাপ গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।
ডাল-পালা ছাঁটাইকরণ:
গোলাপের নতুন ডালে বেশি ফুল হয়। তাই পুরাতন ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করা প্রয়োজন। প্রতিবছর গোলাপ গাছের ডালপালা ছাঁটাই করলে গাছের গঠন কাঠামো সুন্দর ও সুদৃঢ় হয় এবং অধিক হারে বড় আকারের ফুল ফোঁটে।
ফুলের কুড়ি ছাঁটাই:
অনেক সময় ছাঁটাই করার পর মূলগাছের ডালে অনেক পত্রমুকুল ও ফুলকুঁড়ি জন্মায়। সবগুলো কুঁড়ি ফুটতে দিলে ফুল তেমন বড় হয় না। তাই বড় ফুল ফোটার জন্য আসল কুঁড়ি রেখে পাশের কুঁড়ি গুলো ধারালো চাকু দিয়ে কেটে দিতে হয়।
ফুল সংগ্রহ:
ফুল ফোটার পূর্বেই গাছ হতে ফুল সংগ্রহ করতে হয়। সংগ্রহের পর ফুলের ডাটার নিচের অংশ পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে ঠাণ্ডা জায়গায় রাখলে ফুল ভালো থাকে। মাঝে মাঝে ফুলে পানির ছিটা দেওয়া ভালো।
রোগবালাই দমনঃ
|
নাম |
কালো দাগ পড়া রোগ( ছত্রাকজনিত রোগ। ) |
|
লক্ষণ |
১। রোগাক্রান্ত গাছের পাতায় গোলাকার কালো রঙ্গের দাগ পড়ে। ২। আক্রান্ত গাছের পাতা ঝরে গিয়ে গাছ পত্রশূন্য হয়ে যায়। ৩। চৈত্র থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত এ রোগের আক্রমণ ঘটে। |
|
প্রতিকার |
১। এ রোগের প্রতিকারের জন্য গাছে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। ২। গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সে দিকে খেয়াল করতে হবে। ৩। এ ছাড়া ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে এ রোগ দমন করা যায়। আক্রান্ত পাতাগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। |
|
নাম |
ডাইব্যাক |
|
লক্ষণ |
১। ডাল ছাঁটাইয়ের কাটা স্থানে এ রোগ আক্রমণ করে। ২। এ রোগ হলে গাছের ডাল বা কাণ্ড মাথা থেকে কালো হয়ে নিচের দিকে মরতে থাকে। ৩। এ লক্ষণ ক্রমে কাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে এবং সম্পূর্ণ গাছ মারা যায়। |
|
প্রতিকার |
১। এ রোগ দমন করতে হলে আক্রান্ত কাণ্ড বা ডালের বেশ নিচ থেকে কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। ২। ডাল ছাঁটাইয়ের চাকু জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ডাল ছাঁটাই করা উচিত। ৩। কর্তিত স্থান স্পিরিট দিয়ে মুছে দিতে হবে। |
|
নাম |
পাউডারি মিলডিউ (ছত্রাক জনিত রোগ) |
|
লক্ষণ |
১। শীতকালে কুয়াশার সময় এ রোগে বিস্তার ঘটে। ২। এ রোগে আক্রান্ত হলে পাতা, কচিফুল ও কলিতে সাদা পাউডার দেখা যায়। ৩। ফলে কুঁড়ি না ফুটে নষ্ট হয়ে যায়। |
|
প্রতিকার |
১। এ রোগ দমন করতে হলে আক্রান্ত ডগা বা পাতা তুলে পুড়িয়ে দিতে হবে। ২। এছাড়া থিওভিট বা সালফার ডাইথেন এম-৪৫ পানিতে মিশিয়ে সপ্তাহে একবার সেপ্র করে এ রোগ করা যায়। |
পোকামাকড় দমনঃ
|
নাম |
রেড স্কেল বা আঁশ পোকা |
|
লক্ষন |
গাছের বাকলে ছোট ছোট কালো দাগ পড়ে । |
|
প্রতিকার |
এ পোকা দমনের জন্য ডায়াজন ৬০ ইসি প্রয়োগ করতে হবে।গাছের সংখ্যা কম হলে দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়ে আক্রান্ত স্থানে ব্রাশ করলে পোকা পড়ে যায়। |
|
নাম |
চ্যাঁফার বিটল |
|
লক্ষন |
এ পোকা রাতের বেলা গাছের শিকড় ,কচি পাতাও ফুলের পাপড়ি ছিদ্র করে খায়। পাতা বা পাপড়ি ঝাঁঝরা করে ফেলে। |
|
প্রতিকার |
১। আলোর ফাঁদ পেতে ও পোকা দমন করা যায়। ২। ডায়াজন ৬০ ইসি ১৫ দিন অন্তর প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যায়। |
|
নাম |
জাব পোকা |
|
লক্ষন |
১। জানুয়ারী থেকে মার্চের মধ্যে গোলাপে জাব পোকার আক্রমণ দেখা গেলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ফেব্রুয়ারীতে।শুষ্ক দিনে আক্রমনের মাত্রা বেশি হয়। ২। আক্রান্ত স্থান দুর্বল হয়ে শুকিয়ে যায়, গাছের কাণ্ড সরু হয়ে যায়,যার ফলে শাখা-প্রশাখা কমে যায়,গাছ নিস্তেজ হয়ে যায় এবং আক্রান্ত কুড়ি ফোটে না,ফুলের উৎপাদন কমে যায়। ৩। গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয় বা কমে যায়।ফুলের কুঁড়িতে ধরলে কুঁড়ি ফোটে না। |
|
প্রতিকার |
·
নিয়মিত গোলাপের টব বা বাগান পরিদর্শন করতে হবে। কোন গাছে জাব পোকার উপস্থিতি দেখা গেলে তা দমনের বাবস্থা নিতে হবে। ·
প্রাথমিকভাবে কোন গাছের ২/১ টি পাতার আক্রমন দেখা গেলে সেসব পাতা তুলে পাতার পোকা পিষে মেরে ফেলতে হবে। ·
আধা লিটার পানিতে ১-২ টি তামাক পাতা ৩-৪ দিন ভিজিয়ে রেখে সেই দ্রবন পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে সেই মিশ্রণ স্পঞ্জে নিয়ে জাব পোকা আক্রান্ত স্থানে স্থানে আস্তে মুছে দিলে জাব পোকা ছলে যায়। এভাবে প্রতি ১০ দিন অন্তর ৩ বার মুছে দিলে জাব পোকা থাকে না। টবের গোলাপ গাছে বা বাগানে লাগানো স্বল্প কয়েকটি গাছে অল্প আক্রমন দেখা গেলে এ পদ্ধতিতে ভাল ফল পাওয়া যায় । ·
আক্রান্ত গাছে ১ লিটার পানিতে ৩-৪ গ্রাম ডিটারজেন্ট বা গুঁড়ো সাবান গুলে স্প্রে করা যেতে পারে। ·
আক্রমন বেশি হলে গোলাপ ক্ষেতে বা আক্রান্ত গাছে সুপারিশকৃত যে কোন কীটনাশক মাত্রানুযায়ী স্প্রে করতে হবে।নিমতলে নিম্বিসিডিন প্রয়োগ করেও জাব পোকা নিয়ন্ত্রন করা যায়। ·
অথবা সাইফানন ৫৭ ইসি বা বাইকাও-১ ঔষধ স্প্রে করা যেতে পারে। |
|
নাম |
গোলাপের কুঁড়ি ছিদ্রকারি পোকা |
|
লক্ষন |
·
ফাল্গুন মাসের শেষে চৈত্র মাসের প্রথমে এদের প্রাদুর্ভাব ঘটে ।প্রথমে মথ পাতার নিচে গুচ্ছাকারে ডিম পারে। তিন থেকে সাড়ে তিন দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বা কীরা বের হয়ে প্রথমেই ছুটে চলে যায় কুড়িতে , কুড়ির কচি নরম অংশ খেয়ে এরা পিউপা বা পুত্তলি দশায় পৌঁছে মাটিতে চলে যায়। এ সময়টা ১৩-১৪ দিন । এ সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমানে ক্ষতি করে থাকে।লার্ভা অবস্থায় এরা সব কুড়িতে ক্ষতি করে দিতে পারে। ·
কুঁড়ি খেয়ে নষ্ট করে।পোকার কীরা কুড়ির ভেতরের অংশ খাওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে আসে। |
|
প্রতিকার |
·
বিষ টোপের ব্যাবহারও বেশ কার্যকরী। ·
প্রথম দিকে নিমজাত নির্যাস ব্যবহার কার্যকরী। ·
জমির চারপাশে পাখি বসার ব্যবস্থা করতে হবে। |
|
নাম |
পাতা মাছি পোকা |
|
লক্ষন |
এরা গোলাপ গাছের পাতা খুব সুক্ষভাবে কেটে দেয়।ফলে গাছ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। |
|
প্রতিকার |
আক্রান্ত গাছে সুমিথিওন ৫০ ইসি কীটনাশক মাত্রানুযায়ী স্প্রে করতে হবে। |
|
নাম |
সাদা মাছি |
|
লক্ষন |
রস চুষে খায় এবং এর ফলে পাতাগুলো বাদামি রং ধারন করে ও শুকিয়ে ঝর পড়ে। |
|
প্রতিকার |
আক্রান্ত গাছে টলস্টার ২.৫ ইসি কীটনাশক মাত্রানুযায়ী গাছের পাতা ভাল করে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। |
মন্তব্যঃ এই ফুলটা দেখতে অনেকটা ডালিয়া ফুলের মতই সুন্দর।