পান চাষের পদ্ধতি | পানের নানা জাতের বর্ণনা | পানের বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার

পান চাষ - Betel Leaf

পান -চাষ - Betel- Leaf

ভূমিকা:

পান একটি অর্থকরী ফসলপানে নানা রকম ভেষজ গুণ রয়েছে আমাদের দেশে বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, খুলনা, জামালপুর, ফরিদপুর ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানের চাষ হয় সাধারণত বরজ তৈরি করে পানের চাষ করতে হয় অনেক স্থানেই সুপারি গাছ এবং অন্যান্য গাছের গোড়ায় পানগাছ লাগানো হয় এসব পানকে বলা হয় গাছপান একটি পানের বরজ ১০-২০ বছর পর্যন্ত রাখা যায় এরপর নতুন স্থানে বরজ করে পান চাষ করতে হয়

 পানের জাত

1.    বাংলা,

2.    মিঠা,

3.    সাচি,

4.    কর্পূরী,

5.    গ্যাচ,

6.    নাতিয়াবাসুত,

7.    উজানী,

8.    মাঘি,

9.    দেশী,

10.     বরিশাল

11.     ঝালি প্রভৃতি

 বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব জাতের পান চাষ হয় তা নিচে উল্লেখ করা হলো-

পানের জাত অঞ্চল

জাতের নাম

অঞ্চল

চালতা গোটা

বরিশাল

মহানলী

বরিশাল

চেরফুলী

বরিশাল

মিঠাপান

চট্টগ্রাম বরিশাল

সাচিপান

মহেশখালী

গাছপান

উখিয়া, টেকনাফ, এবং সিলেট

বাংলাপান

উখিয়া

মিষ্টিপান

যশোর

ভাবনা

যশোর

ভোলাপান

ভোলা

ঝালপান

যশোর

ভাওলা

ময়মনসিংহ

সন্তোষী

নবাবগঞ্জ

রংপুরী পান

রংপুর


চাষের উপযোগী পরিবেশ মাটি

·        পান চাষের জন্য সবচেয়ে অনুকূল আবহাওয়া হচ্ছে খরিফ মৌসুম

·        উষ্ণ আর্দ্র আবহাওয়া পান চাষের জন্য উপযোগী

·        সূর্যের আলোতে পান ভালো হয়না তাই পান চাষের জন্য কৃত্রিম ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে

·        পানের জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে

·        কম বৃষ্টিপাত, শুষ্ক আবহাওয়া, উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচন্ড বাতাস এবং বেশি ঠান্ডা আবহাওয়ায় পান ভালো হয়না

·        সাধারণত উঁচু জমি যেখানে পানি দাঁড়ায় না এমন দো-আঁশ মাটি পান চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে

·        লালচে দো-আঁশ মাটিতেও সঠিক পরিমাণে জৈব পলিমাটি মিশিয়ে পান চাষ করা যাবে

·        অনেকদিন পতিত অবস্থায় আছে এমন এঁটেল মাটিও পান চাষের জন্য উপযোগী

·        জমির কাছে সেচের পানির উৎস থাকতে হবে

·        পান চাষের জন্য নির্বাচিত জমির মাটি একদিকে বা দুদিকে ঢালু থাকতে হবে

জমি তৈরি

·        পানের জমি ভালোভাবে চাষ করে নিতে হবে

·        আবাদি জমিতে হালকা চাষ দিতে হবে এবং অনাবাদি জমিতে গভীরভাবে চাষ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে

·        গাছের গুঁড়ি, গুল্ম জাতীয় গাছের শিকড় ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে

·        জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে আগাছা বাছাই করে, মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে

·        বৃষ্টির পানি জমা বন্ধ করতে জমি একদিকে সামান্য ঢালু রাখতে হবে

·        জমি চাষ করে কিছুদিন ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে

·        মাঝে মাঝে লাঙ্গল দিয়ে মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে

·        চারাগাছের জন্য পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে

·        বাতাস বেশি হলে চারদিকে বাতাস প্রতিরোধী গাছ লাগাতে হবে

·        সেচ পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে

·        পানের লতা লাগানোর আগে কোন সার প্রয়োগ করা যাবে না

বেড তৈরি

·        আয়তনের উপর ভিত্তি করে চলাফেরার সুবিধার জন্য জমিকে কয়েকটি ব্লকে ভাগ করে নিতে হবে

·        প্রতিটি ব্লকে কতগুলো বেড থাকবে সেখানে পান গাছ লাগাতে হবে

·        প্রতিটি বেড ৫০ সে.মি. চওড়া এবং ১৫ সে.মি. উঁচু হবে

·        প্রতি বেডে দুইটি সারি থাকবে

·        সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২০-২৫ সে.মি.

·        প্রতিটি সারির বাইরের দিকে ১২. সে.মি. জায়গা ফাঁকা থাকবে

·        প্রতিটি সারিতে একটি গাছ থেকে অপর গাছের দূরত্ব হবে ১৫-২০ সে.মি.

·        দুই সারি বিশিষ্ট একটি বেড থেকে অপর বেডের দূরত্ব হবে ৫০ সে.মি.

 পানের কাটিং তৈরি

·        পানের বংশবিস্তার লতা বা কাটিং এর মাধ্যমে করতে হবে

·        কাটিং তৈরির জন্য সুস্থ সবল রোগহীন বীজ-লতা বাছাই করতে হবে

·        বাছাই করা লতা থেকে - মাস পান সংগ্রহ বন্ধ রাখতে হবে

·        বীজতলার বয়স - বছরের মধ্যে হলে ভালো হবে

·        পানের লতার উপরের এবং মাঝের অংশ কাটিং হিসেবে ব্যবহার করতে হবে

·        কাটিং এর দৈর্ঘ্য ৩০-৪৫ সে.মি. হতে হবে তবে অঞ্চলভেদে ১০ সে.মি. অথবা ৮০ সে.মি. হতে পারে

·        প্রতি ৩৩ শতাংশ (১বিঘা) জমির জন্য ৮৫৮০-৯২৪০টি কাটিং লাগবে

·        বীজতলা থেকে কাটিং সংগ্রহ করে প্রায় ৮০টির মতো কাটিং একসাথে বেঁধে একটা বান্ডিল তৈরি করতে হবে

·        বান্ডিল কাদা মেখে ছায়া আছে এমন জায়গায় রেখে প্রতিদিন - বার নতুন করে কাদা লাগিয়ে দিতে হবে অথবা পানি দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া কাদা নরম করে দিতে হবে

·        - দিনের মধ্যে কাটিং এর গিট থেকে নতুন শিকড় বের হলে কাটিং লাগানোর উপযুক্ত হবে

·        দিনের বেশি কাটিং রাখা যাবে না

 চারা রোপণ

·        প্রতিটি বেডে দুটি সারি থাকবে প্রতিটি সারিতে ১৫-২০ সে.মি. পরপর একটি করে গর্ত করতে হবে

·        প্রতিটি গর্তে একটি করে কাটিং সারিবদ্ধভাবে লাগাতে হবে

·        রোপণের এক মাসের মধ্যে গিরা থেকে অঙ্কুর এবং আগায় নতুন কুশি বের হবে

·        সময় যখন লতা বড় হতে থাকবে তখন নতুন লতা দুমিটার লম্বা চিকন বাঁশের খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে

চারা রোপণের সময়

আমাদের দেশে সাধারণত বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পানের চারা লাগানো হয়ে থাকে কোথাও আবার শীতের শুরুতে এবং শীতের শেষেও পানের চারা লাগানো হয় নিচে অঞ্চলভেদে পানের চারা লাগানোর সময় দেয়া হলো-

অঞ্চল

রোপণের সময়

 

বরিশাল

জুন-জুলাই

রাজশাহী

ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল

বাগেরহাট

জুন-জুলাই

নড়াইল

মার্চ-এপ্রিল

চট্টগ্রাম

জুন-সেপ্টেম্বর

কক্সবাজার

আগস্ট-সেপ্টেম্বর

যশোর

জুন-আগস্ট

 অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা

সেচ নিষ্কাশন

·        জমি যাতে খুব বেশি ভেজা বা শুকনো না হয় সেজন্য পানের জমিতে ঘনঘন হালকা সেচ দিতে হবে

·        লতা নামানোর সময় স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন সেচ দিতে হবে

লতা নামানো

·        পানের লতা বরজের (পান চাষের জন্য তৈরি ছাউনি বা ঘর) ছাউনি পর্যন্ত (-. মিটার উচ্চতা) পৌঁছালে তা টেনে নিচে নামিয়ে পাতাছাড়া অংশকে পেঁচিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে একে বলে পানের লতা নামানো

·        বছরে সাধরাণত দুবার (১৫ ফেব্রুয়ারি-১৫ এপ্রিল এবং ১৫ জুলাই-১৫ সেপ্টেম্বর) পানের লতা নামানো হয়

·        লতা নামানোর আগে সংগ্রহ করার যোগ্য সব পান তুলে ফেলতে হবে

·        লতার উপরের ৩০-৫০ সে.মি. অংশ মাটির উপরে রেখে নিচের অংশটুকু গোল করে অথবা বাংলা এর মতো করে পেঁচিয়ে মাটির নিচে পুঁতে দিতে হবে

চাষের সময় পরিচর্যা

বর্ষা মৌসুমে মাসে - বার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে

 সার প্রয়োগ

নের জমিতে প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি ১৫ মণ গোবর সার প্রয়োগ করতে হয় চারা / পাতাওয়ালা হলেই পচা খৈল জাতীয় সার প্রয়োগ করলে গাছ সতেজ হয়ে ওঠে বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি ইউরিয়া বারে জমিতে প্রয়োগ করতে হয় উক্ত সারের সঙ্গে কেজি টিএসপি বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি পটাশ সার মিশ্রিত করে প্রয়োগ করতে হয় উক্ত সার বারে সারির উভয় পার্শ্বে - ইঞ্চি গভীরতায় প্রয়োগ করতে হয় 

পান সংগ্রহ

·        পানের লতা লাগানোর - মাসের মধ্যে পান পাতা তোলার উপযুক্ত হবে

·        রবি মৌসুমে দেরিতে এবং খরিফ মৌসুমে দ্রুত পান সংগ্রহ করা যাবে

·        বর্ষাকালে প্রতিটি লতা থেকে সপ্তাহে দুবার পাকা পাতা সংগ্রহ করা যাবে

·        রবি মৌসুমে এবং খরার সময়ে নিয়মিত সেচের ব্যবস্থা করতে পারলে পাতা সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো যাবে

·        পাতা হলুদ হওয়ার আগে না তুললে বাজারদর কমে যাবে

·        বোঁটাসহ পান লতা থেকে হাত দিয়ে ছিঁড়ে সংগ্রহ করতে হবে

সতর্কতা

·        পানে কীটনাশক ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে

·        বালাইনাশক ছিটানোর আগে পান তুলে নিতে হবে এবং ব্যবহারের কমপক্ষে - সপ্তাহের মধ্যে পান পাতা সংগ্রহ করা যাবে না

বাছাই প্রক্রিয়াজাতকরণ

·        পান সংগ্রহ করার পর বাছাই করে ছোট, কাঁচা, ছেঁড়া, কাটা, পোকা রোগে আক্রান্ত পান বাদ দিতে হবে

·        পানের আকার, খাওয়ার উপযোগী, পুরুত্ব ইত্যাদি অনুযায়ী পান বাছাই করতে হবে

·        পাতা বেশিক্ষণ সতেজ রাখার জন্য প্যাকিং করার সময় একটু পানি ছিটিয়ে দিতে হবে

·        পান পচনশীল হওয়ায় পান তুলার পরপরই তা বিক্রি করতে হবে


রোগবালাই দমন

নাম

পানের গোড়া পচা রোগ

লক্ষণ

গাছের গোড়ায় মাটির কাছে একটি মধ্যপর্ব কাল বর্ন ধারণ করে এবং এর উপরে সাদা সাদা মাইসেলিয়াম দেখা যায়

হাতের চাপ দিলে আঁশ ছিঁড়ে পৃথক হবে আঙ্গুল পিচ্ছিল হবে

পরবর্তিতে হঠাৎ লতা, পাতা ডগা ঢলে পড়ে 

প্রতিকার

রোপনের পুর্বে লতা শোধন করা(প্রতি লিটার পানিতে গ্রাম ব্যাভিষ্টিন)

সরিষার খৈল এর সাথে ডায়থেন এম-৪৫ বা কুপ্রাভিট মিশিয়ে ব্যবহার করা

আক্রান্ত গাছের গোড়ায় কপার অক্সিক্লোরাইড বা % বর্দোমিকচার ব্যবহার করা

রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে . মিলি স্কোর বা গ্রাম কুপ্রাভিট বা . গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করা 

নাম

পানের কান্ড পচা রোগ ছত্রাক রোগ

লক্ষণ

কান্ডে ছত্রাকের আক্রমন হয়

বর্ষার শেষে বা লতা নামানোর পর ক্ষতি নজরে পড়ে

আক্রান্ত গাছের পাতা সহ কান্ড হলুদাভ বাদামী রঙ ধারণ করে এর ফলে পাতা ঝরে পড়ে, কান্ড ভেঙ্গে বা শুকিয়ে যায়

প্রতিকার

পানের বরজে রোদ সরাসরি লতায় না পড়ে

আক্রান্ত পাতা/কাণ্ড তুলে নষ্ট বা পুড়ে ফেলা

আক্রমন বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে গ্রাম মেনকোজেব বা গ্রাম কুপ্রাভিট ব্যবহার করা

নাম

পানের পাতা পচা ছত্রাক রোগ

লক্ষণ

বর্ষায় রোগ দেখা যায় রোগের আক্রমনে নিচের পাতার শীর্ষে বা কিনারায় প্রথমে হলুদাভ বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়

তাপমাত্রা বেশি হলে / দিনে পাতা পচে যায়

প্রতিকার

. গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ বা কুপ্রাভিট- গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন অন্তর / বার স্প্রে করা

খইলের সাথে কুপ্রাভিট প্রয়োগ করে উপকার পাওয়া যায়   

নাম

পানের পাতার দাগ পড়া রোগ ছত্রাক রোগ

লক্ষণ

রোগের আক্রমনে পাতায় বিক্ষিপ্ত ভাবে বিভিন্ন দাগ দেখা যায়

দাগের মাঝখানে ঝলসানোর মতো মনে হয় কিছুটা শুষ্ক দেখায়

প্রতিকার

আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট বা পুড়ে ফেলা

আক্রমন বেশি হলে % বর্দোমিকচার ডাইথেন এম-৪৫ গ্রাম কুপ্রাভিট- গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন স্প্রে করা প্রতি লিটার পানিতে স্কোর . মিলি ব্যবহার করা

পোকামাকড় দমন

নাম

পানের কালো মাছি

লক্ষণ

·        পূর্ণ বয়স্ক পোকা কিড়া উভয় অবস্হায় এরা ক্ষতি করে

·        এরা পান পাতার রস চুষে খায়

·        আক্রান্ত পাতা হাল্কা বাদামী রঙের হয়

প্রতিকার

·        আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে নস্ট করা

·        পানের বরজ আশ পাশ পরিস্কার করা

·        আক্রমন বেশি হলে টলস্টার মিলি , ডায়মেথয়েট ( পারফেকথিয়ন) ১মিলি বা চেজ ১গ্রাম /লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা

নাম

পানের বরজের উইপোকা

লক্ষণ

 

·        এটি বরজ তৈরি উপকরন নষ্ট করে

·        ফলে পানের বরজ খাড়া থাকতে পারে না

·        এতে ফলন কমে যায়

প্রতিকার

·        মুড়ি পান চাষ না করা

·        সেচ দিয়ে ক্ষেত ডুবিয়ে রাখা

·        উইপোকার ডিভি সংগ্রহ করে রানীকে মেরে ফেলা

·        আক্রান্ত জমিতে মাটির পাতিলে পাটখড়ি ভরে পুঁতে রাখলে উইপোকা পাতিলে জমা হবে

·        আক্রমন বেশি হলে আক্রান্ত স্থানে ক্লোরপাইরিফস( ডার্সবান) মিলি প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা