সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা

সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা (IPM)
Integrated Pest Management

সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা

সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা


আই পি এম (IPM) বা সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা এর পরিচয়

আই পি এম বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বলতে পরিবেশকে দুষণমুক্ত রেখে প্রয়োজনে এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা রোগ বালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমার নিচে রাখাকে বুঝায়, যাতে করে:পরিবেশ দূষিত না হয় উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ, বালাই সহনশীল জাত আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাই নাশকের সময়োচিত যুক্তি সঙ্গত ব্যবহারকে নিশ্চিত করে

আই পি এম-এর উপকারিতা

·        আই পি এম গ্রহনের ফলে উপকারী পোকা মাকড়, মাছ, ব্যাঙ, পশু, পাখী গুইশাপ প্রভৃতি সংরক্ষণ করা যায়

·        বালাইনাশকের যুক্তি সঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, যথেচ্ছ ব্যবহার না হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে

·        বালাইনাশকের পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোধ করা সম্ভব হয় এতে করে বালাইনাশক জনিত দুর্ঘটনা সহজেই এড়ানো যায়

·        ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় বালাইনাশক সহনশীলতা অর্জন করার সুযোগ পায় না

·        বালাই- এর পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা কম

·        সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং দুষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়

আই পি এম- এর পাঁচটি উপাদান:

. উপকারী পোকামাকড় প্রাণী সংরক্ষণ:

. জৈবিক দমনে ব্যাঙ, চিল, পেঁচা, গুইসাপ, মাকড়সা, লেডী বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল, বোলতা, মিরিড বাগ, ওয়াটার বাগ, ড্যামসেল ফড়িং প্রভৃতি উপকারী পোকামাকড় অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিকারক পোকা দমনে যথেষ্ট সাহায্য করে
. উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য :

·        ধান ক্ষেতের আইলে শিম শসা জাতীয় ফসল আবাদ করা

·        জমিতে পরিমিত পরিমাণ পানি রাখা

·        ফসল কাটার অন্তত: / ঘন্টা পর জমিতে লাঙল দেওয়া

·        ফসল কাটার পর আইলে কিছু খরকুটা বিছিয়ে দেওয়া

·         জমিতে বাঁশের বুষ্টার স্থাপনের মাধ্যমে বোলতা প্রতিপালন করা

·        বালাইনাশকের এলোপাতাড়ি ব্যবহার পরিহার করা

. বালাই সহনশীল জাতের চাষাবাদ:

ক্ষতিকারক পোকামাকড় রোগের আক্রমণ অনেকাংশে রোধ করতে পারে যেমন-

·        বি আর ২৬ : সাদা-পিঠ গাছ ফড়িং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধশীল এবং পাতাপোড়া রোগ, বাদামি গাছ ফড়িং সবুজ পাতা ফড়িং আক্রমণে মধ্যম প্রতিরোধশীলবাদামী গাছ ফড়িং সবুজ পাত ফড়িং আক্রমণে মধ্যম প্রতিরোধশীল

·        ব্রি ধান ২৭: সাদা পিঠ গাছ ফড়িং এর আক্রমনে প্রতিরোধশীলটুংরো, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া রোগ এবং বাদামি গাছ ফড়িং পামরী পোকার আক্রমণে মধ্যম প্রতিরোধশী

·        ব্রি ধান ৩১: বাদামি গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণে প্রতিরোধশীল এবং পাতা পোড়া টুংরো রোগে মধ্যম প্রতিরোধশীল

·        ব্রি ধান ৩৫: বাদামি গাছ ফড়িং প্রতিরোধশীল এবং টুংরো রোগ মধ্যম প্রতিরোধশীল

আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ব্যবহার:

সুস্থ বীজ, সঠিক দূরত্বে রোপন, সবল চারা, সুষম সার, আগাছা মুক্ত জমি, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, সারিতে রোপণ আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহনে অধিক ফলন পাওয়া যায়

. যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি:

·        হাত জালের সাহায্যে পোকা ধরে মারা

·        আলোর ফাঁদে পোকা ধরা

·        আক্রান্ত পাতার আগা কেটে দেওয়া

·        পাখি বসার জন্য ডাল পুঁতা

·        হাত দিয়ে পোকার ডিম সংগ্রহ করে ধংশ করা এসব পদ্ধতি ব্যবহারে বালাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়

. রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা:

·        নিয়মিতভাবে অপকারী উপকারী পোকামাকড়ের উপস্থিতি জরিপ করা

·    সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কেবল আক্রান্ত জমিতে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়, সঠিক মাত্রায় সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করা

প্রথম ৪টি উপাদানের সাহায্যে যদি ক্ষতিকারক পোকা- মাকড় রোগের আক্রমণ দমিয়ে রাখা সম্ভব না হয়, কেবল তখনই সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করা র্অথাৎ পোকার সংখ্যা অর্থনৈতিক দ্বারপ্রান্তে (ইটিএল) পৌঁছে গেলে তখনই বালাইনাশক সঠিকভাবে ব্যবহার করা দরকার

Sex Pheromon (সেক্স ফেরোমন)

ফেরোমনের উদ্দেশ্য

অধিক হারে পোকা আটকানো, পোকার প্রজনন কাজে বাধা সৃষ্টি করে তাদের বংশবিস্তার রোধ করা কুমড়াজাতীয় ফসলে যে সময় ফুল আসে তখনই জমিতে ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে

ক্ষতির ধরন

মাছি পোকা সাধারণত তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য কুমড়াজাতীয় কচি ফলের মধ্যে হুল ফুটিয়ে ডিম পাড়ে আর কচি ফলে ডিম পেড়ে দিলে সেই ফলটা আস্তে আস্তে হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে যায় অথবা ফলটা পূর্ণাঙ্গ হবে না এরপর ফলের ভেতরে মাছির ডিম থেকে কিড়া বের হয়ে ফলের ভেতরের কচি অংশ খেয়ে ফেলে ক্ষতিসাধন করে থাকে

পোকার সেক্স ফেরোমন

এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক জৈব রাসায়নিক সেমিও কেমিক্যাল যা কোনো প্রজাতির স্ত্রী পোকা কর্তৃক নিঃসৃত হয় একই প্রজাতির পুরুষ পোকাকে প্রজনন কার্যে আকৃষ্ট করার জন্য সেক্স ফেরোমনের সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি একটি প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত জৈব পদার্থ যা জীব পরিবেশের কোনোরূপ ক্ষতিসাধন করে না

ফেরোমন ফাঁদ

এটি তিনটি উপাদানে তৈরি- . সেক্স ফেরোমন টোপ বা লিউর . একটি ফাঁদ প্রায় ২২ সেন্টিমিটার লম্বা গোলাকার বা চারকোণবিশিষ্ট প্লাস্টিকের ফাঁদ যা দুই পাশে পাত্রের তলা থেকে থেকে সেন্টিমিটার ওপরে ত্রিভুজ আকৃতিতে কাটা . ফাঁদ স্থাপনের জন্য দুটি বাঁশের খুঁটি

লিউর নির্বাচন

কুমড়াজাতীয় সবজি যেমন- লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, করলা, পটোল, তরমুজ, বাঙ্গির জন্য ফেরোমন নির্বাচন করতে হবে

ফাঁদ স্থাপনের পদ্ধতি

দুপাশে ত্রিভুজাকৃতির ফাঁকযুক্ত পাস্টিকের বৈয়ামের ভেতর বিশেষ কৌশলে আটকানো একটি তাবিজের মত জিনিস এর ভেতরে থাকে পুরুষ মাছি পোকাকে আকৃষ্ট করার জন্য এক ধরনের গন্ধ নিচে এক দেড় ইঞ্চি পরিমাণ ক্ষারযুক্ত পানি গন্ধে মাছি ছুটে আসে এবং ক্ষার পানিতে পরে মারা যায় জমির আইল থেকে মিটার ভেতরের দিকে প্রতি ১০ মিটার পর পর বর্গাকারে ফাঁদ স্থাপন করতে হবে দুটি খুঁটি দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে তার মাঝে টোপ ফাঁদটি বসিয়ে খুঁটির সঙ্গে ভালোভাবে বেঁধে দিতে হবে অতঃপর ফাঁদের নিচের অংশ থেকে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ সাবানমিশ্রিত পানি দিতে হবে

ফাঁদ স্থাপনে করণীয়

প্রতি দুই থেকে তিনদিন পর পর ফাঁদ পর্যক্ষেণ করতে হবে ফাঁদের মধ্যে মারা যাওয়া পোকা সরিয়ে ফেলতে হবে গাছের উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁদটিকে ওপরে উঠিয়ে দিতে হবে কুমড়াজাতীয় ফসলে লিউর একবার ব্যবহারই যথেষ্ট

পাখি দ্বারা পোকা দমন (পার্চিং পদ্ধতি)

কৃষকরা ফসলের ক্ষতিকর পোকা নিধনে ক্ষেতে বিষের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে ক্ষতিকর পোকা নিধনে বিষের বিকল্প হিসাবে কৃষক ক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতি হিসাবে জীবন্ত ধঞ্চেগাছ ডালপালা পদ্ধতি ব্যবহার করা ক্ষেতে পুঁতে রাখা ধঞ্চে গাছ বা ডালে বসে পাখিরা বিভিন্ন পোকা খেয়ে ফেলে পোকা নিধনে বিষের বিকল্প হিসাবে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে জমি নিরাপদ থাকছে ধান ক্ষেতে শক্র পোকা যেমন কারেন্ট, মাজরা, গান্ধি, চুঙ্গি পোকাসহ বাদামী ঘাস ফড়িং নিধনে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়

আলোর ফাঁদ

ফাঁকা জায়গায় বাঁশের খুঁটিতে - ফুট উঁচুতে হ্যাজাক লাইট বা বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে এর নিচে বড় একটি পাত্রে সাবানের গুঁড়া মিশ্রিত পানি রেখে 'আলোর ফাঁদের' ব্যবস্থা করা হয় এবং ফসলের ক্ষতিকর সবুজ পাতা ফড়িং, মাজরা পোকা, চুঙ্গি পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, গান্ধিপোকাসহ ক্ষতিকর অন্যান্য পোকা আলোক ফাঁদ পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ পোকা দমন উভয়েই কার্যকর ধানের কুশি অবস্থা হতে দুধঅবস্থা পর্যন্ত আলোক ফাঁদ দেয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে সন্ধ্যার সময় একটি ব্লকে জমির সকল কৃষককে একত্রে আলোক ফাঁদ দিতে হবে জমি থেকে ৫০ মিটার দূরে কমপক্ষে পরপর দিন আলোক ফাঁদ দিতে হবে পরপর তিন দিন না দিলে পোকার উপস্থিতি বেড়ে যাবে

আঠালো ফাঁদ

ইঁদুর বা পোকা ফাঁদে আটকানোর জন্য বিশেষ আঠালো ফাঁদ এটি বিষাক্ত এবং নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য

ব্যবহারের ধরন: 12 ইঞ্চি অনুপাত 12 ইঞ্চি একটি বর্গাকার কার্ড বোর্ড বা কাঠের তক্তা ব্যবহার করুন কেন্দ্রে একটি স্পট ছাড়া সম্পূর্ন কার্ড বোর্ডের পৃষ্ঠের উপর RAT GLUE প্রয়োগ করুন

হাতজাল ব্যবহার

ধানের কুশি পর্যায় পর্যন্ত হাতজাল খুবই কার্যকর কেননা , ১টি মাজরা পোকা কমপক্ষে ২৫০ হতে ৪০০ টি পর্যন্ত ডিম দেয় এবং ডিম পারার সাথে সাথে স্ত্রী পোকা মারা যায় তাই, ২টি স্ত্রী মাজরা পোকা ধরা মানে কমপক্ষে ৫০০টি মাজরা পোকা নষ্ট করা ফসল দেখার জন্য কৃষকরা এমনিতেই জমিতে যান কাজেই, সেই সময় যদি হাতজাল সাথে নিয়ে পোকা ধরা যায়, তাহলে খুব অনায়াসেই পোকা দমন হয়

দমনযোগ্য পোকা: মাজরা, পাতা মোড়ানো পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং,

বন্ধু পোকা সংরক্ষণ পালন

যেসব পোকা সরাসরি অন্য পোকা ধরে খায় বা অন্য পোকার উপর আশ্রয় নেয় খাদ্য গ্রহণ করে এবং শেষে মেরে ফেলে তাদের বন্ধু পোকা বলে বন্ধু পোকা সংরক্ষণের জন্য নির্বিচারে জমিতে বিষ স্প্রে করা যাবেনা বন্ধু পোকা মূলত: দুই প্রকার

) পরভোজী পোকা: যেসব পোকা সরাসরি অন্য পোকা ধরে খায় যেমন: লেডি বার্ড বিটল

) পরজীবি পোকা: যেসব পোকা অন্য পোকার উপর আশ্রয় নেয় খাদ্য গ্রহণ করে এবং শেষে মেরে ফেলে

ধানের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিম্নরুপ


. উপকারী পোকামাকড় প্রাণী সংরক্ষণ করুন

·        আইল ফসলের চাষ

·        বাঁশের তৈরি বুস্টার স্থাপন

·        পেস্টি সাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার পরিহার করুন

·        ফসল তোলার পর আইলের উপর নাড়া বিছিয়ে দেয়া

. বালাই সহনশীল জাতের চাষ করুন:

ব্রি ধান -২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৩৫; বাদামি গাছ ফড়িং, পামরী, সাদা-পিঠ গাছ ফড়িং, টুংরো,বস্নাস্ট পাতা পোড়া, খোল পোড়া, কান্ডপচা রোগ

. যান্ত্রিক উপায়ে দমন

·        আক্রান্ত পাতার অগ্রভাগ কর্তন করে

·        পোকার ডিম নষ্ট করা

·        হাত জালের সাহায্যে পোকা ধরে মারা

·        ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস' করা

·        আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা মারা

·        ফাঁদ পেতে ইঁদুর ধরে মারা

. আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি

·        সুস্থ বীজ চারা ব্যবহার করা

·        সুষম সার প্রযোগ

·        আগাছা বাছাই করা

·        সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা

·        ফসলের সমকালীন চাষাবাদ

·        লাইন করে চারা লাগানো

. রাসায়নিক পদ্ধতিতে দমন: সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসাবে বালাইনাশক নিয়ম মাফিক ব্যবহার করুন


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ